স্টাফ রিপোর্টার published: ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৯:২৬ এএম

রাজশাহী নগরীর সিটি বাইপাস এলাকায় এক সাধারণ গ্যারেজ মালিকের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গাড়ি আত্মসাৎ এবং পরোক্ষভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী নগর যুবদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। পাজেরো জিপ গাড়ি কেনার আগে ‘ট্রায়াল’ দেওয়ার নাম করে নিয়ে আর ফেরত দেননি ওই নেতা। শুধু তাই নয়,উল্টো গাড়িটি নিজের দাবি করে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে এলাকা ছাড়া করার হুমকি ও রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ নিরুপায় হয়ে নগর যুবদলের দপ্তর সম্পাদক এসএম সফিক মাহমুদ তন্ময়-এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ট্রায়ালের নামে প্রতারণা
রাজশাহীর সিটি বাইপাস বন্ধ গেট এলাকায় ‘নুর আহমেদ মোটরস’ নামের একটি গ্যারেজের মালিক নুর মোহাম্মদ। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে সেখানে গাড়ি মেরামতের পাশাপাশি পুরাতন গাড়ি কেনাবেচা করেন। মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর বর্ণনা মতে, গত ১৮ নভেম্বর বিকেলে যুবদল নেতা সফিক মাহমুদ তন্ময় গাড়ি কেনার আগ্রহ দেখিয়ে নুর মোহাম্মদের গ্যারেজে আসেন। সেখানে থাকা একটি সাদা রঙের পাজেরো হার্প (Pajero Harp) জিপ (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ঢাকা মেট্রো গ-০২-০৮৭০) পছন্দ করেন তিনি।
বিকাল ৪টার দিকে তন্ময় জানান, তিনি গাড়িটি চালিয়ে দেখতে চান (টেস্ট ড্রাইভ)। পরিচিত এবং রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় নুর মোহাম্মদ সরল বিশ্বাসে গাড়ির চাবি তার হাতে দেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হলেও তন্ময় আর গাড়ি নিয়ে ফিরে আসেননি।
চাঁদাবাজির নতুন কৌশল ও হুমকি
ভুক্তভোগী নুর মোহাম্মদের অভিযোগ,গাড়িটি ফেরত চাইতে গেলে শুরু হয় আসল নাটক। তন্ময় প্রথমে কয়েকদিন সময় নিলেও পরে তিনি দাবি করেন,এই গাড়ি তার নিজের। এমনকি গাড়ি ফেরত চাইলে উল্টো বড় অংকের টাকা দাবি করা হয় অথবা গাড়িটি তাকে ‘উপহার’ হিসেবে দিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়—যাকে ভুক্তভোগী পরোক্ষ চাঁদাবাজি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নুর মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, “আমি একজন মেহনতি মানুষ। গত বছরের ১২ এপ্রিল মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায় গাড়িটি কিনেছিলাম। সব আসল কাগজপত্র ও এফিডেভিট আমার নামে। কিন্তু তন্ময় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমার গাড়িটি দখল করে নিয়েছেন। আমি যখনই চাপ দিই, তখনই তিনি আমাকে হুমকি দেন যে শহরে থাকতে হলে তাকে দেখেই থাকতে হবে।”
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর গত ৮ ডিসেম্বর নুর মোহাম্মদ রাজপাড়া থানায় অভিযোগ করতে গেলেও তাকে তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, থানার তৎকালীন ওসি মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন যে, রাজনৈতিক নেতা ও টাকা-পয়সার বিষয় হওয়ায় পুলিশ গাড়ি উদ্ধার করতে পারবে না। পুলিশের এমন রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
আদালতের হস্তক্ষেপ
থানায় প্রতিকার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে রাজশাহীর বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে (রাজপাড়া আমলী আদালত) মামলা করেন নুর মোহাম্মদ। মামলার নম্বর: ৬৩৭ সি/২০২৫। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৭৯ (চুরি), ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৫০৬ (হুমকি) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে রাজপাড়া থানাকে তদন্তপূর্বক দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত ও পুলিশের ভাষ্য
অভিযুক্ত যুবদল নেতা সফিক মাহমুদ তন্ময় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি গাড়িটি আওয়ামী লীগ নেতা রাজিব মতিনের কাছ থেকে কিনেছেন। তবে রাজিব মতিন বর্তমানে পলাতক থাকায় তিনি কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
অন্যদিকে,রাজপাড়া থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মালেক জানান, “আদালতের নির্দেশের কপি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় যার গাড়ি তাকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ
একজন শ্রমজীবী ব্যবসায়ীর ওপর এমন রাজনৈতিক দাপট ও সম্পদ দখলের ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রাজনৈতিক পালাবদলের পর যদি সাধারণ মানুষের সম্পদ এভাবে জবরদখল করা হয়, তবে আমরা কোথায় নিরাপদ? তারা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং গাড়িটি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।