ইফতেখার আলম বিশাল published: ২৩ অক্টোবর, ২০২৫, ১০:২৭ এএম
.jpg)
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে সেই স্বৈরাচারী সংস্কৃতির ছায়া রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে নতুন করে। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-তে সম্প্রতি বিতর্কিত নেতা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি ঘিরে রাজশাহী ও রংপুর নেসকো বিভাগে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির জন্য কুখ্যাত শ্রমিক লীগ নেতাদের 'পুরস্কৃত' করা হয়েছে এই পদোন্নতির মাধ্যমে।
বিতর্কিত পদোন্নতি ও অফিস আদেশ গত ৭ অক্টোবর নেসকোর উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) মো. রহমত উল্লাহ-আল ফারুকের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে টেকনিক্যাল কোরের সাতজন কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এই আদেশে ফোরম্যান-এ এবং দুজন ফোরম্যান-বি পদোন্নতি পেয়ে যথাক্রমে ১১তম থেকে ১০ম গ্রেড ও ১০ম থেকে ৯ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন। আদেশে বলা হয়, পদোন্নতিপ্রাপ্তরা ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে যোগদান পত্র দাখিল করেন এবং ২১৪তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই পদোন্নতি কার্যকর করা হয়।
তবে এই পদোন্নতির তালিকায় থাকা নামগুলোর মধ্যে নেসকো বিদ্যুৎ শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সিরাজুল ইসলাম দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক দাপটের জন্য কুখ্যাত ছিলেন বলে নেসকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পরিচিত। নেসকো জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এমন একজন বিতর্কিত নেতাকে আবারও পদোন্নতি দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
নেতাকর্মীরা বলছেন, "জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় অংশ নিয়েছিলেন নেসকো শ্রমিক লীগের নেতারা, যার নেতৃত্বে ছিলেন সেরাজুল ইসলাম নিজে। অথচ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও তিনি শুধু বহাল তবিয়তেই নন, বরং পদোন্নতিও পেয়েছেন—এটা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না।"
সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন তার পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করেছেন। এই সুপারিশকে ঘিরে নেসকোর ভেতরে সমালোচনা তুঙ্গে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই।" তার এই নীরবতা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সংশয় বাড়িয়েছে।
সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি যে পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, সেই পদটি তার বিভাগে (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩) নেই। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি নেসকোর চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করে ২২ বছর ধরে একই বিভাগে বহাল আছেন। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তিন বছরের অধিক একই কর্মস্থলে থাকতে পারবেন না।
সিরাজুল ইসলামের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। গত ১২ জুলাই ২০২৫ রাজশাহী ভুবনমোহন পার্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ড. আব্দুল মঈন খানের পেছনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে ছবি তোলার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতীক' হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। বিষয়টিকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশের পর সিরাজুল ইসলাম বেশকিছুদিন অফিস করেননি। পরে মহানগর ছাত্রদলের তোপের মুখে পড়েন শ্রমিক লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম।
৫ আগস্টের পর শ্রমিক লীগের অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে গেলেও নেসকো প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট অংশ এখনো তাদের প্রতি নরম। এরই সুযোগ নিয়ে এই নেতারা পুনরায় প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নেসকোর অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, "পদোন্নতির এই তালিকা ছিল একতরফা। মেধা, অভিজ্ঞতা বা কর্মদক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই এখানে মুখ্য বিবেচ্য হয়েছে।" বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও প্রশাসনিক কাঠামোতে যদি তার 'দোসররা' পুরস্কৃত হতে থাকে, তবে তা গণতন্ত্র ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্য বড় হুমকি। নেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার চালু থাকলে তা কেবল প্রতিষ্ঠানের সুনামই ক্ষুণ্ণ করবে না, কর্মক্ষেত্রে অন্যায় ও অসন্তোষও বাড়াবে।
নেসকো জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। নাগরিক সমাজের দাবি, এখনই এসব বিতর্কিত পদোন্নতির স্বচ্ছ তদন্ত করা হোক এবং যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের পুরস্কৃত করতে চাইছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিস্ট দোসরদের পুরস্কৃত করা মানে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করা। নিজেকে ঘিরে তৈরি হওয়া পদোন্নতির বিতর্ক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নেসকো শ্রমিক লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না, একমাত্র কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।"
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) এর সাম্প্রতিক বিতর্কিত পদোন্নতি প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) আবু হায়াত মুহাম্মদ রহমতউল্লাহ তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তিনি বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই প্রাধান্য পেয়েছে। তার ভাষ্যমতে, "ভাইবা বোর্ডে যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, একমাত্র তাদেরই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।"
তবে বিতর্কিত নেতাদের পদোন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বিধিমালা উল্লেখ করে বলেন, "পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা বা ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত কিন্তু চার্জশিটভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি পেতে বাধা নেই।" এছাড়াও, একই কর্মস্থলে দীর্ঘকাল ধরে থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাহী পরিচালক জানান, বর্তমানে যারা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে বদলি করা হবে।