বাংলাদেশ, শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

রেশমের তৈরি সুতা থেকে উৎপাদিত কাপড়—বিক্রি হচ্ছে নিজস্ব শোরুমে

স্বপ্নের বাংলাদেশ বার্তাকক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

published: 15 March, 2026, 03:36 AM

রেশমের তৈরি সুতা থেকে উৎপাদিত কাপড়—বিক্রি হচ্ছে নিজস্ব শোরুমে

প্রতিটি উৎসবে সিল্ক কাপড়ের জুড়ি মেলে ভার। অন্যান্য কাপড় যত দামিই হোক না কেন, তার সঙ্গে একটা সিল্ক কাপড় থাকলে সেটিই আগে পছন্দের তালিকায় রাখেন বাঙালি বধূরা। ফলে ইদ এলে সিল্ক কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। বিশেষ করে যারা সামর্থ্যবান পরিবার এবং সিল্ক কাপড়ের প্রতি যাদের আগ্রহ বরাবর থাকে, তাদের মধ্যে ইদের সময় এই কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে এবার ইদকে ঘিরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।




সিল্ক মানেই কাপড়ের জগতে দেশজুড়ে বাড়তি কদর। এ জন্য রেশম নগরীও বলা হয় রাজশাহীকে। সিল্কসিটি নামে আছে একটি ট্রেনও। তবে সিল্কের কাপড় উৎপাদন যদি হয় সরকারিভাবে তাহলে তো কথায় নেই। এর চাহিদা যেমন বাড়ছে ঠিক তেমনই বাড়ছে বিক্রিও। শুধু রাজশাহী নয়, এর চাহিদা এখন দেশজুড়ে। রাজশাহী রেশম কারখানা থেকে সরাসরি হচ্ছে কাপড় উৎপাদন। বিক্রি করা হচ্ছে নিজস্ব শোরুমে। এখান থেকে অনেক ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন কাপড়। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকেও আসছেন এখানে কাপড় কিনতে।




‘বনের পাতা খেয়ে পোকা দেয় সোনার টাকা’- সিল্কের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত প্রবাদ এটি। রাজশাহী অঞ্চলে সরকারি তত্ত্বাবধানে ১৯৫২ সালে রাজশাহী সিল্কের যাত্রা শুরু হয় যা বাংলাদেশে প্রথম। রাজশাহী রেশম কারখানা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা, যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের পর এই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পটি রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আসে।




লোকসানের মুখে এক পর্যায়ে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর এ কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য ১৬ বছর পর ২০১৭ সালের শেষ দিকে পরীক্ষামূলক পুনরায় এটি চালু করা হয়। কারখানাটি চালুর পর এর ৪২টি লুম মেরামত করা হয়। বর্তমানে এর ১৯টি লুমে ৪১ জন শ্রমিক ও তাঁতি কাপড় উৎপাদন করছেন। চালু হয়েছে বন্ধ শোরুমও। এই শোরুমে বিক্রি হচ্ছে সরকারি কারখানার পোশাক।




রেশমের গুটি থেকে বের করা হচ্ছে সুতা। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিবছর এই গুটি চাষের মাধ্যমে উৎপাদন করছে। রেশম চাষিদের উৎপাদিত গুটি কিনে মিনিফিলেচার কেন্দ্রে করা হয় সুতার উৎপাদন। কারখানা চালুর পর গেল জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৩৬৬ মিটার কাপড় উৎপাদন করা হয়েছে। বছরে গড়ে ৭ হাজার মিটার কাপড় উৎপাদন হয়ে থাকে। কারখানার নিজস্ব শোরুমে  প্রতি মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পোশাক বিক্রি হচ্ছে।   




সরেজমিনে রাজশাহী রেশম কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রথমে গুটি থেকে সুতা উৎপাদন করছেন। সেই সুতা থেকে তাঁতযন্ত্রে (লুম) গিয়ে বোনা হচ্ছে কাপড়। তারপর এই কাপড় বিভিন্ন রঙে নিয়ে আসা হচ্ছে। তারপর করা হচ্ছে বিভিন্ন রকমের প্রিন্ট। আকার ঠিক করে শোরুমে যাচ্ছে বিক্রির জন্য। এই কারখানা থেকে প্রতি মাসে ২৫০ মিটার কাপড় উৎপাদন করা হচ্ছে।




রেশম বোর্ডের শোরুমও কারখানার সঙ্গে লাগোয়া। রাজশাহী নগরীর শিরোইল এলাকায় রেল স্টেশনসংলগ্ন বিশাল জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই কারখানা। শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে পোশাক। গরদের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে আট হাজার টাকায়। টাইয়ের কাপড় এক হাজার ৫২০ টাকা গজ। ২/২ গ্রে-থান ৭৫০ টাকা গজ। প্রিন্টেড শাড়ি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। নারীদের টু-পিস ৩ হাজার ৮৯০ টাকায়। ওড়না বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯২৫ টাকায়। স্কার্ফ বা হিজাব প্রতিটির দাম ৯৬০ টাকা।




এছাড়াও গজ হিসেবে কাপড় বিক্রি করা হয়। যা থেকে শার্ট, পাঞ্জাবি, নারীদের ওয়ানপিসও তৈরি করা যায়। স্ট্রাইপ সুপার বলাকা বিক্রি করা হচ্ছে এক হাজার টাকা গজ, সুপার বলাকা ৯৫০ টাকা গজ, ডুপিয়ন সার্টিন (টাইডাই) প্রতি গজ ৯০০ টাকা, ডুপিয়ন সার্টিন ৮৫০ টাকা, ২/৪ গ্রে-থান ৯৫০ টাকা, মটকা থান ৯৩৮ টাকা গজে বিক্রি করা হচ্ছে।




২০০৫ সালে এক কেজি সুতার দাম ছিল এক হাজার টাকা। বর্তমানে সেই সুতার দাম কেজিপ্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বর্তমানে রেশম উন্নয়ন বোর্ড নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা কেজি দরে দেশি সুতা বিক্রি করছে বেসরকারি কারখানা মালিকদের কাছে।




রেশমের উন্নয়নে সরকারিভাবে কয়েকটি প্রকল্প চালু রয়েছে। সুতার চাহিদা মেটাতে প্রতি বছরই তুঁতগাছ লাগানো হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যেই রেশম সুতার উৎপাদন বাড়বে। তখন দেশি সুতাতেই শতভাগ রেশম তৈরি হবে। দেশের জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহী সিল্ক। ক্রেতার চাহিদা ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্কের আরও বেশি প্রচার ও প্রসার ঘটানো সম্ভব।




রাজশাহী রেশম কারখানার অপারেশন ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম টুটুল বলেন, বর্তমানে ১৯টি লুমে কাপড় উৎপাদন চলছে। এই লুমগুলোও অনেক পুরনো। এখানে কাপড় উৎপাদনে অনেক ধীরগতি। তারপরও আমরা প্রতি দিন এখানে পাঁচ থেকে ১০ গজ কাপড় উৎপাদন করছি। নানা প্রতিবন্ধকতায় এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখানে শতভাগ রেশমের কাপড় পাওয়া যায়।




রাজশাহী রেশম উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক তরিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের রেশম শিল্পের উন্নয়ন হচ্ছে। রেশমের উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন প্রকল্প গড়ে উঠছে। আগামীতে ১৫ কোটি টাকার সবুজ পাতার একটি প্রকল্প ও বাস্তবায়ন হলে রেশম শিল্পের আরও উন্নয়ন হবে। আমরা বেশকিছু নতুন মাতৃজাত উদ্ভাবন করতে পেরেছি। আমাদের ১১৪টি জাত রয়েছে। তুঁতের জাত ৭৩টি থেকে ৮৪টি করা হয়েছে।




তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিকল্পনায় কারখানাকে আরও উন্নত করা হবে। যা ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। জমি বাড়িয়ে তুঁত চাষের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। আমরা শতভাগ সিল্ক সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে চায়। রেশম রাজশাহীর একটি ব্র্যান্ড তা আবারও পরিচিত হয়ে উঠবে।

National