রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রতিদিনই অনেক রোগী ভর্তি হন। তাদের কেউ কেউ আসেন একেবারে ‘পরিচয়হীন’ হয়ে।
তাদের ঠিকানা মেলে না, স্বজন আসে না, তাৎক্ষণিক পরিচয়ও জানা যায় না। তাতে কী আসে যায়! আলেয়া বেগমের হাত থেমে থাকে না। কারও জ্বর মুছে দেন, কপালে পানি দেন, পরিষ্কার করেন ক্ষতস্থান। কারও কারও চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা অশ্রুও মুছে দেন তিনি পরম মমতায়।
প্রায় এক যুগ ধরে এভাবেই অজ্ঞাত রোগীদের সেবাযত্ম দিয়ে সুস্থ করে তুলছেন আলেয়া বেগম। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের হেতেমখাঁ কারিগরপাড়ায়। ২০০৬ সালে তিনি হাসপাতালে একজন আয়া হিসেবে কাজ শুরু করেন। চাকরি স্থায়ী নয়। প্রতিবছর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কিছু জনবল নেয়। সেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবেই কাজ করেন আলেয়া। এবার এক বছরের জন্য তার নিয়োগ হয়েছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। তবে সেই পরিচয় ছাপিয়ে আলেয়া অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের কাছে হয়ে উঠেছেন অভিভাবক, একান্ত আপনজন।
আগে হাসপাতালের ওয়ার্ডের সামনেই বারান্দায় এসব রোগীদের সেবা দিয়ে যেতেন আলেয়া। গতবছর হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহাম্মদ তাকে আলাদা একটি ওয়ার্ডই করে দিয়েছেন। সেখানে সাতটি শয্যা। সব সময়ই পরিচয়হীন রোগী থাকে সেখানে। এতদিন আলেয়া একাই সব সামলে আসছিলেন। এখন তার সঙ্গে আরও দুই নারীকে দেওয়া হয়েছে। তিনজনে মিলে এ রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
বুধবার দুপুরে হাসপাতালে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেল, অজ্ঞাত ব্যক্তিদের এ ওয়ার্ডে সাতজন ভর্তি আছেন। ওয়ার্ডটি বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দুবছরের ছেলেকে কোলে নিয়েই ওয়ার্ডে রোগীদের সেবায় কাজ করছেন আলেয়া বেগম। এক বৃদ্ধের পায়ের ব্যান্ডেজ খুলতে খুলতে বললেন, ‘পায়ের ভেতর কতগুলো পোকা ছিল? আজকে নাই। আরাম হয়েছে?’ বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ’। নাম-পরিচয়হীন আরেক বৃদ্ধ বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসে আছেন। নিজের পরিচয় জানাতে না পারা এ বৃদ্ধ আলেয়াকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমার মেয়ে।’ পাশে হেসে উঠে আলেয়া বললেন, ‘নিজের নাম-পরিচয় বলতে পারে না। কিন্তু আমাকে মেয়ে ভাবে।’ পাশে একটি শয্যায় শুয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন আরেক বৃদ্ধা। তাকে তুলেও ওষুধ খাইয়ে দিলেন আলেয়া। পাশের বেডে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক তরুণী। পায়ে দগদগে ক্ষত। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আলেয়া বেগম বললেন, ‘তিনমাস ধরে আছে। যাওয়ার জায়গা নাই। মনে হচ্ছে, একেও আমার বল্টুর মতো বাড়িতে নিয়ে যাওয়া লাগবে।’
বল্টু আলেয়া বেগমের বাড়িতেই ছেলের মতো থাকে। একযুগ আগে বল্টু যখন কিশোর তখন ট্রেনের নিচে পড়ে তার দুই পা কাটা পড়ে। আলেয়া হাসপাতালে সেবা শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তোলেন। দুই পা ছাড়া বল্টুকে ছেড়ে দিতে পারেননি আলেয়া। আশ্রয় দেন নিজের বাড়িতেই। আলেয়া বললেন, ‘এই মেয়েটার যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। সুস্থ হলে সে আমার বাড়িতে থাকতে পারে। আগে বাসাবাড়িতে কাজ করত। সুস্থ হয়ে দরকার হলে তাই করবে।’
আলেয়া আরো জানান, কখনও রাস্তা থেকে লোকজন এসব রোগীদের তুলে এনে ভর্তি করেন। কখনও দুর্ঘটনায় তারা আহত হলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এনে দিয়ে যান। যে ওয়ার্ডেই ভর্তি করা হোক না কেন, ওই ওয়ার্ড থেকে এসব পরিচয়হীন রোগীদের তার ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। এখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহায়তা নিয়ে এ রোগীদের নাম-ঠিকানাও বের করছেন আলেয়া। তারপর স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
তিনি বলেন, এর ‘আগে অনেক অজ্ঞাত রোগী মারা যাওয়ার পর লাশ মর্গে রেখে সিআইডির মাধ্যমে আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় বের করা হতো। সেটা দেখে আমি হাসপাতালের পরিচালকের কাছে চিঠি লিখি। অনুরোধ করি, মৃত্যুর পর এভাবে পরিচয় বের না করে আগেই সেটা করলে আমরা তাদের পরিবারের কাছে ফেরাতে পারব। পরিচালক আমার অনুরোধ গ্রহণ করে সিআইডির সঙ্গে কথা বলেন। এখন আমি একটা অনুরোধ করে চিঠি লিখলেই সিআইডির সদস্যরা এসে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে যান। অনেকের পরিচয় মেলে। আবার অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র করা থাকে না বলে আঙ্গুলের ছাপ দিয়েও পরিচয় পাওয়া যায় না।’
তিনি জানান, কেউ কেউ ভাঙা ভাঙা শব্দে এলাকার নাম জানাতে পারেন। সুস্থ হলে তিনি অনেকটা আন্দাজ করেই ওই রোগীকে নিয়ে সেসব এলাকায় যান। এভাবে কারও কারও বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়। সম্প্রতি এভাবে নাটোরের বনপাড়ার এক রোগীকে বাড়িতে রেখে এসেছেন।
আলেয়া বেগম প্রতিবেদককে জানালেন, এই রোগীদের সেবার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করে। রোগীদের সেবাযত্নে ও খাওয়া-দাওয়ার জন্য টাকাও খরচ হয়। এ জন্য হাসপাতালেই থাকা সমাজসেবা অফিস থেকে কিছুটা সহযোগিতা পাওয়া যায়। আলেয়া জানান, তিনি যতদিন হাসপাতালে থাকবেন ততদিনই এভাবে অজ্ঞাত রোগীদের সেবা করে যাবেন। তিনি বললেন, ‘নাম না থাকুক, তারাও তো মানুষ। তাদেরকেও তো দেখতে হবে।’
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফএম শামীম আহাম্মদ দৈনিক স্বপ্নের বাংলাদেশ পত্রিকাকে বলেন, ‘এ ধরনের রোগীদের সেবা করার জন্য মানবিক গুণ প্রয়োজন। আলেয়ার ভেতরে মানবিক গুণ আছে আমি মনে করি। আলেয়া যা করছে, তা অত্যন্ত মানবিক। তার কাজ যাতে সুন্দরভাবে হয়, সে জন্য আলাদা একটা ওয়ার্ডই করে দিয়েছি। তার সঙ্গে আরও দুজনকে দিয়েছি। তাদের বেতন যেন নিয়মিত হয়, সেটা নিশ্চিত করেছি। আমরা এখন আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে অজ্ঞাত রোগীদের পরিচয় বের করি। পরিচয় পেলে আলেয়া নিজেই তাদের বাড়ি গিয়ে রোগীদের তাদের স্বজনদের কাছে রেখে আসে।’