বাংলাদেশ, সোমবার, মে ২৫, ২০২৬

এক কার্ডেই হোক সব সমাধান

স্বপ্নের বাংলাদেশ বার্তাকক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

published: 28 January, 2026, 01:38 AM

এক কার্ডেই হোক সব সমাধান

বাংলাদেশ যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নির্মাণের চূড়ান্ত লগ্ন পার করছে, তখন নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাসের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে মানিব্যাগে জমে থাকা একগুচ্ছ প্লাস্টিক কার্ড আর ফাইলের ভেতরে বন্দি কাগজের স্তূপ। আধুনিক মাইক্রোচিপ-সম্বলিত এনআইডি (NID) থাকার পরেও কেন একজন নাগরিককে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড কিংবা ওএমএস কার্ড আলাদাভাবে বহন করতে হবে? এই সংকট কেবল কারিগরি অদক্ষতা নয়; এটি একটি গভীরতর প্রশাসনিক ব্যাধি। একে আমি বলছি ‘ডিজিটাল সামন্তবাদ’। যেখানে তথ্যই বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতার উৎস, সেখানে নাগরিক সেবা সহজ করার চেয়ে দপ্তরগুলোর নিজস্ব আধিপত্য ও তথ্যের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই যেন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।


​ প্রকিউরমেন্ট ইকোনমি ও তথ্যের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ  : 

আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো এখন একেকটি বিচ্ছিন্ন তথ্যের দ্বীপে পরিণত হয়েছে। জন্মনিবন্ধন, এনআইডি এবং পাসপোর্টের ডাটাবেজগুলো আজও একসূত্রে গাঁথা সম্ভব হয়নি। এই কৃত্রিম বিভাজনের নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত কেনাকাটার অর্থনীতি বা ‘প্রকিউরমেন্ট ইকোনমি’। প্রতিটি নতুন কার্ডের প্রকল্প মানেই বিশাল অংকের টেন্ডার, হার্ডওয়্যার আমদানি ও লজিস্টিক সাপোর্টের বিশাল কর্মযজ্ঞ। যদি একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে সব সেবা একীভূত করা যেত, তবে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। কিন্তু নাগরিক সুবিধার পরিবর্তে এখানে প্রকল্পের বাজেট বাস্তবায়নই যেন অলিখিত অগ্রাধিকার পাচ্ছে। রাষ্ট্র এক হাতে প্রযুক্তির কথা বলছে, অন্য হাতে নাগরিকের করের টাকা স্রেফ অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের পেছনে অপচয় করছে।


 ​পেপারলেস সার্ভিস ও পরিবেশ সুরক্ষার অঙ্গীকার  :



​ডিজিটাল রূপান্তরের ডামাডোলের মাঝেও আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো কাগজের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। প্রতি বছর কোটি কোটি আবেদনপত্রের প্রিন্ট, ফটোকপি এবং সত্যায়নের জন্য যে পরিমাণ কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে, তার জন্য নিধন করা হচ্ছে বিশাল অরণ্য। অথচ বায়োমেট্রিক এবং ডিজিটাল সিগনেচার পদ্ধতিতে যদি তথ্য যাচাই করা যেত, তবে কেন নাগরিককে ফাইলের বোঝা নিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে? পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের এখনই পূর্ণাঙ্গ ‘পেপারলেস সার্ভিস’ বা কাগজবিহীন সেবা চালু করা জরুরি। প্লাস্টিক ও কাগজের এই বিপুল ব্যবহার কমিয়ে আমরা কেবল ভোগান্তিই নয়, বরং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পৃথিবীকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে পারি। ইস্তোনিয়ার মতো দেশগুলো যদি ৯৯% সরকারি সেবা পেপারলেস করতে পারে, তবে আমরা কেন প্লাস্টিকের জঞ্জালে আটকে থাকব?


​ নিরাপত্তার আধুনিক সমাধান: ব্লকচেইন ও জিরো-নলেজ প্রুফ  :



কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার হ্যাক হওয়ার যে চিরাচরিত ভয় নীতিনির্ধারকদের তাড়া করে ফেরে, আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রযুক্তিতে তার স্থায়ী সমাধান রয়েছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে নাগরিকের তথ্য কোনো একক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থেকে একটি সুরক্ষিত নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে থাকে, যা তথ্যের অবৈধ পরিবর্তন বা জালিয়াতি প্রযুক্তিগতভাবেই অসম্ভব করে তোলে। এর সাথে যুক্ত হতে পারে ‘জিরো-নলেজ প্রুফ’ (ZKP) প্রযুক্তি, যেখানে নাগরিক তার স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করেই নিজের সত্যতা প্রমাণ করতে পারবেন। এতে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ‘প্রাইভেসি’ যেমন অক্ষুণ্ণ থাকবে, তেমনি তথ্যের অপব্যবহারও রোধ হবে। এটি কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি নাগরিকের আস্থার নাম।


​ স্মার্ট উত্তরণের পঞ্চমুখী রূপরেখা : 



  • একীভূত আইডি: জন্মনিবন্ধন থেকে পাসপোর্ট পর্যন্ত সব সেবার জন্য একটি অভিন্ন ডিজিটাল আইডি কাঠামো গড়ে তোলা।
  • নিরাপদ তথ্য বিনিময়: দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্যের আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা যেন নাগরিককে বারবার তথ্য দিতে না হয়।
  • ডিজিটাল ওয়ালেট : প্লাস্টিক কার্ডের বোঝা কমিয়ে স্মার্টফোনে কিউআর কোড ভিত্তিক পরিচয় ব্যবস্থা চালু করা।
  • সত্যায়ন প্রথার বিলোপ: ডিজিটাল সিগনেচার ও ভেরিফিকেশনকে আইনি ভিত্তি দিয়ে কাগজের ফাইল জমার সংস্কৃতি বন্ধ করা।
  • ওন্স-অনলি পলিসি: নাগরিক থেকে জীবনে একবারই তথ্য নেওয়ার জাতীয় নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।


উপসংহার 


​প্লাস্টিক ও কাগজের পাহাড় সরিয়ে এবং জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি-র মধ্যে একটি অভিন্ন ডাটাবেজ তৈরি করে যখন আমরা সব সেবা একটি কিউআর কোড বা ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারব, তখনই নাগরিক জীবনের প্রকৃত মুক্তি আসবে। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে কেবল ডিভাইসের আধিক্য নয়; স্মার্ট বাংলাদেশ মানে হলো একটি ঝামেলামুক্ত, সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি। এখন সময় এসেছে এই ডিজিটাল সামন্তবাদ ভেঙে একটি স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী ও টেকসই রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার। যেখানে নাগরিক সেবার মূল কেন্দ্রে থাকবে মানুষ, কোনো প্লাস্টিক কার্ড বা কাগজের ফাইল নয়।


লেখক পরিচিতি : 
মো. শামীউল আলীম শাওন
শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত অধিকার ও উন্নয়নকর্মী।


National