সর্বশেষ
বিরোধী দল দমনে দুদক ব্যবহারের অভিযোগ আসিফ মাহমুদের মীর কাসেমের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে: ডা. শফিক দুই দশক পর সংসদে ফিরে আবেগাপ্লুত মির্জা আব্বাস জামায়াত আমিরের কাছে ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যা সাড়ে ৫ মাস পর দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস রামেকের অনিয়ম ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি তানজিদ শুধু বগুড়ার নয়, বাংলাদেশের ছেলে: প্রধানমন্ত্রী অনুকূল পরিবেশ ছাড়া ভারত সফর নয়: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তফসিল স্থগিতের রিট, যা বললেন ইসি সচিব সাইবার সুরক্ষা ও আইসিটি খাতে একসাথে কাজ করবে বাংলাদেশ-লিথুয়ানিয়া কিশোরগঞ্জে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুলশানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাসব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন
প্রচ্ছদ / সারাদেশ
সারাদেশ

বিচারকের ঘরে খুনে স্তব্ধ কলম বিরতির

বিচারকের ঘরে খুনে স্তব্ধ কলম বিরতির

মর্গের সামনে অনেক মানুষ,বেশির ভাগই বিচারক। রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমান সহকর্মীদের কাছে ছেলের স্মৃতিচারণ করছেন। মর্গের ভেতরে তখন আদরের ছেলে তাওসিফ রহমানের (১৬) মরদেহের ময়নাতদন্ত চলছে। সহকর্মীরা বারবার চেয়ার এনে বসতে অনুরোধ করছিলেন আব্দুর রহমানকে। তিনি একটু বসছিলেন, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন। তখনো মানসিকভাবে বেশ শক্তই ছিলেন তিনি। কিন্তু ময়নাতদন্ত শেষে মর্গের ভেতরে ঢুকে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ছেলের মরদেহের পাশে। ডুকরে কেঁদে উঠলেন।


বিচারক আব্দুর রহমানের এমন শোকের সময় তাঁর সহকর্মীরাও নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি। রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতের বিচারক-ম্যাজিস্ট্রেট,



কর্মকর্তা- কর্মচারী সবাই চোখের পানি ফেলেছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের মর্গের সামনে এমন শোকাবহ দৃশ্যই চোখে পড়ে। বিচারকের ঘরে নৃশংস খুনের ঘটনায় শোকে স্তব্ধ রাজশাহীর বিচারাঙ্গন।


বিচারকেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছেন।মর্গের সামনে কথা হয় কয়েক বিচারকের সঙ্গে। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। একজন বিচারক বলেন, 'বিচারক হত্যাক হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করেন। তাঁর ঘরেই যখন এমন নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে, তখন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকেই।'


মর্গের সামনে ছিলেন বিভিন্ন আদালতের কর্মচারীরাও। তাঁরাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিচারক আব্দুর রহমান লম্বা-চওড়া মানুষ। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের বলছিলেন, 'আমার ছেলেটাও বেশ লম্বা হয়েছিল। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। লম্বা হয়ে গিয়েছিল। এখন শুধু স্বাস্থ্যটা একটু ভালো হতো। ওর পছন্দ ছিল মুরগির মাংস। ইদানীং বলে বলে শাক-সবজি খাওয়া শেখাচ্ছিলাম।'


অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু: 


মরদেহের ময়নাতদন্ত করেন রামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. কফিল উদ্দিন এবং একই বিভাগের প্রভাষক শারমিন সোবহান কাবেরী। ডা. কফিল উদ্দিন জানান, তাওসিফের ডান ঊরু, ডান পা ও বাঁ বাহুতে ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে। এই তিন জায়গার রক্তনালি কেটে গিয়েছিল। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও হয়েছিল শরীরে। তাঁরা মনে করছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।


জজ আব্দুর রহমান প্রায় এক বছর আগে শ্রম আদালতের বিচারক হয়ে রাজশাহী আসেন। গত মাসে তাঁকে মহানগর দায়রা জজ হিসেবে পদায়ন করা হয়। রাজশাহী আসার পর নগরের ডাবতলা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে তাওসিফকে নিয়ে থাকতেন। গত বৃহস্পতিবার সেখানে ছুরিকাঘাতে খুন হয় তাওসিফ। আহত হন জজের স্ত্রী তাসমিন নাহারও। এ সময় ধস্তাধস্তিতে আহত হন অভিযুক্ত হামলাকারী লিমন মিয়াও। নিহত তাওসিফ রাজশাহী গভ. ল্যাবরেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।


হত্যা মামলা করলেন বিচারক : 


তাওসিফ খুনের ঘটনায় তার বাবা রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেছেন। গতকাল দুপুরে তিনি মামলার এজাহারে সই দিয়ে ছেলের লাশ নিয়ে জামালপুরের সরিষাবাড়ির চকপাড়ায় গ্রামের বাড়ি রওনা হন। পরে রাজপাড়া থানা পুলিশ মামলাটি রেকর্ড করে।


রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, 'বিচারক নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি লিমন মিয়া (৩৪)। তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশের হেফাজতে হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা শেষে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে।'


পুলিশ জানিয়েছে, লিমনের চিকিৎসা চলছে। আগের দিন তিনি ছিলেন রামেক হাসপাতালের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। তবে গতকাল ওই ওয়ার্ডে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। লিমন কোথায়, তা ওয়ার্ডের নার্সেরা বলতে পারেননি। জজের স্ত্রী তাসমিন নাহার আছেন হাসপাতালের কেবিনে। শুক্রবার সকালে কেবিনের সামনে একজন নারী পুলিশ সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনকে দেখা যায়। তবে তাঁরা কথা বলতে চাননি বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহারের সঙ্গে লিমনের পরিচয় ছিল। তাঁর কাছ থেকে লিমন টাকা নিতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।


পুলিশের ভাষ্য, টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন লিমন। এ নিয়ে ৬ নভেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বিচারকের স্ত্রী তাসমিন।


আইন অনুযায়ী ছেলের বিচার হোক


গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, লিমন মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনেরপাড়া ভবানীগঞ্জ গ্রামে। তাঁর বাবার নাম এস এম সোলায়মান শেখ। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য ও ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। লিমন সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে চাকরি করতেন। ২০১৮ সালে তাঁর চাকরি চলে যায়। এরপর থেকে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া হাট ও বালাসী ঘাট এলাকায় বালু ব্যবসাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন লিমন, তবে সংসার টেকেনি।


লিমনের বাবা সোলায়মান শেখ জানান, এক মাস আগে চোখের চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় যান লিমন। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ জানত না পরিবার। সোলায়মান শেখ বলেন, 'বিচারকের ছেলে হত্যার ঘটনায় পুলিশ আমার ছেলেকে আটক করেছে বলে শুনেছি। যদি সে জড়িত থাকে, আইন অনুযায়ী তার বিচার হোক; এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।'


সম্পর্কিত খবর