বাংলাদেশ, বুধবার, মে ২৭, ২০২৬
logo

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি মানুষ


আব্দুল আউয়াল সরকার published:  ২৬ মে, ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি মানুষ

পশু কোরবানির মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে নিজের ভেতরের লোভ,অহংকার ও হিংসা নামক ‘মনের পশু’ কোরবানির মাধ্যমে একমাত্র রবের সন্তুষ্টি অর্জনে। বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধি না থাকলে কোরবানির আসল উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ভুলে সব ধরনের বড়াই ও প্রদর্শনের মনোভাব ত্যাগ করা।লোক দেখানো মনোভাব (রিয়া) বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করা। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ দূর করে পারস্পরিক সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করা।


শান্তি,সৌহার্দ আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল আজহা। সব ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। মহান আল্লাহর উদ্দেশে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করা মুসলমানদের প্রাচীন ঐতিহ্য। আল্লাহতায়ালা তার প্রিয়নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্য পরীক্ষা করার জন্য তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দিতে। স্নেহের পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয়। স্নেহ-মমতায় ভরা জগৎ-সংসারে পিতার পক্ষে আপন পুত্রকে কোরবানি দেওয়া অসম্ভব এক অগ্নিপরীক্ষা। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) বিনা দ্বিধায় আপন পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে ছুরির নিচে প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে কোরবানি হয়ে যায় একটি দুম্বা। এই প্রতীকী ঘটনার অন্তর্নিহিত বাণী স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ত্যাগ স্বীকার।


পবিত্র ঈদুল আজহার উদ্দেশ্য স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা। পশু কোরবানি করা হয় প্রতীকী অর্থে। আসলে কোরবানি দিতে হয় মানুষের সব রিপুকে : কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা ও পরশ্রীকাতরতা। সৎ পন্থায় উপার্জিত অর্থের বিনিময়ে কেনা পশু কোরবানির মাধ্যমেই তা সম্পন্ন হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কোরবানির এই মর্মবাণী আমাদের সব সময় স্মরণে থাকে না, বরং ত্যাগের সাধনার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোগবিলাস ও অপচয়। আধ্যাত্মিকতাকে ছাপিয়ে যায় বস্তুগত আনুষ্ঠানিকতা। কোরবানির মধ্যে যে উৎসর্গের মহিমা রয়েছে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভোজনের উৎসব। অথচ এ দেশে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ অন্নকষ্টে ভোগে, অনেক শিশু অপুষ্টিজনিত রোগব্যাধির শিকার। অনেক মানুষের মাথার ওপর আচ্ছাদন নেই, তারা রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে, তীব্র শীতে কষ্ট পায়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানহীন এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুঃখণ্ডদুর্দশার কথা চিন্তা করা এবং সাধ্যমতো তাদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানো সামর্থ্যবানদের একান্ত কর্তব্য।


পবিত্র ঈদুল আজহায় সারা দেশে একই দিনে বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানির কারণে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা একটি সমস্যা হয়ে ওঠে। তাই সবার উচিত যেখানে-সেখানে পশু জবাই করার প্রবণতা ত্যাগ করা। কোরবানির পর পশুর রক্ত, মলমূত্র, হাড় ইত্যাদি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা, নিজ নিজ লোকালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সবার। 

 কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচার ক্ষেত্রেও সততাণ্ডশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, যেন কোনো ধরনের অসদুপায় বা কারসাজির সুযোগ কেউ না পায়।


এই আনন্দময় উৎসবে সকলের  প্রতি রইল ঈদের শুভেচ্ছা। পবিত্র ঈদুল আজহার ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি মানুষ।


কোরবানির গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোরবানির দিন কোরবানির চেয়ে উত্তম আমল আর নেই। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। বিশ্বনবী (স.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।’ সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর এই বাণী থেকে কোরবানির গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা নিঃসন্দেহে বোকামি। কোরবানি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার উপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো বোঝা নয় বরং এটি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) এর অসীম ত্যাগ ও আনুগত্যের স্মৃতিবিজড়িত একটি মহান ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলছেন, ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশত কিংবা রক্ত কিছুই পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।’


‘পবিত্র ঈদুল আযহা একদিকে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে সকল প্রকার অন্যায় অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে সমাজের হত দরিদ্র অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আর্ত মানবতার সেবা করার অপার সুযোগ করে দেয়।’


লোক দেখানো কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোরবানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। উত্তম পশু জবাইয়ের মাধ্যমে যেমন আমরা আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করি, তেমনি ইসলামের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতাও আমাদের অন্তরে জাগ্রত করতে হবে। অন্যথায় কোরবানি কেবল উৎসব ও ভোজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই আমাদের উচিত ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং তাকওয়ার সঙ্গে কোরবানি আদায় করা। তবেই পূর্ণতা পাবে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা।


লেখক:

চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ,শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।