দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে ইতালির পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় তরুণ। কিন্তু ইউরোপের সেই স্বপ্নপথ মাঝপথেই থেমে যায় লিবিয়ার মরুভূমিতে। ইতালিতে পৌঁছানোর আগেই তারা মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে এখন একটি গোপন নির্যাতনকেন্দ্রে (টর্চার সেল) বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের মুক্তির বিনিময়ে দাবি করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা। টাকা আদায়ে প্রতিদিনই তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্মম শারীরিক নির্যাতন, আর সেই হৃদয়বিদারক নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে অসহায় পরিবারগুলোর কাছে মুক্তিপণের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে পাচারকারী চক্র।
জিম্মি হওয়া ছয় যুবক হলেন—খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে ইতালিতে পাঠানোর চুক্তি করা হয়। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় আট মাস আটকে রাখার পর সম্প্রতি আরও একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে প্রত্যেকের জন্য ২৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দেন তার ভাই সামছুল আলম। সেই আশ্বাসে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও ছেলেকে ইতালিতে নেওয়া হয়নি। বরং লিবিয়ায় নিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিদিন নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণের টাকা আদায়ের চাপ দেওয়া হচ্ছে।
একই অভিযোগ করেন সোহেলের বাবা হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, প্রায় আট মাস আগে সামছুল আলমের মাধ্যমে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠান। কিন্তু ইতালির পরিবর্তে লিবিয়ায় গিয়ে সেও দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। এখন তার ওপরও অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
পরিবারগুলোর দাবি, দালালরা ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পরিশোধের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। ভিডিওতে ছেলেদের আর্তনাদ ও নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য দেখে পরিবারগুলো চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত দালাল সামছুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা গত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল দালাল মানিকের সঙ্গেও এখন আর কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
জিম্মি ছয় যুবককে জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছে। একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত এবং লিবিয়ায় জিম্মি থাকা ছয় যুবককে দ্রুত উদ্ধার করতে সরকারের জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।