রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মরদেহ নিয়ে চলছে নিষ্ঠুর ‘লাশ বাণিজ্য’। শোকাতুর স্বজনদের আবেগ আর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাইক্রোবাস চালকদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে অঘোষিত এক সাম্রাজ্য। মরদেহ জিম্মি করে সাধারণ ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে চার গুণ অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের বাধার মুখে বাইরের কোনো গাড়ি মরদেহ পরিবহন করতে পারছে না, যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১ হাজার ৮৩ জন রোগী। নিয়ম অনুযায়ী ৬ নম্বর ইন্টার্ন গেট দিয়ে মরদেহ বের করা হয়। সেখানেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে অন্তত ১৫০টি লক্কড়ঝক্কড় মাইক্রোবাস। তথাকথিত এই ‘অ্যাম্বুলেন্স’ সিন্ডিকেটের অলিখিত নিয়ম হলো—সিরিয়ালে থাকা প্রথম গাড়িটিই নিতে হবে। বাইরের কোনো গাড়ি প্রবেশ করলে বা স্বজনরা অন্য গাড়ি ঠিক করলে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক টাকা আদায় করে তবেই মরদেহ ছাড় দেয় চালকরা।
১৫০০ টাকার ভাড়া ৭০০০!
সম্প্রতি তানোর উপজেলার ফারুক হোসেন তার এক আত্মীয়ের মরদেহ নিয়ে যেতে এই সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েন। মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের পথ যেতে তার কাছ থেকে আদায় করা হয় সাত হাজার টাকা। অথচ স্বাভাবিক ভাড়ায় তা ১,৫০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
সম্প্রতি তানোর উপজেলার ফারুক হোসেন তার এক আত্মীয়ের মরদেহ নিয়ে যেতে এই সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েন। মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের পথ যেতে তার কাছ থেকে আদায় করা হয় সাত হাজার টাকা। অথচ স্বাভাবিক ভাড়ায় তা ১,৫০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
একইভাবে গতকাল দুর্গাপুরের আনসার আলীর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় ২৫ কিলোমিটার পথের জন্য ৫,৫০০ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না চাইলে মরদেহবাহী গাড়ি আটকে দেওয়ার হুমকি দেয় চালকরা। শেষ পর্যন্ত দাবি করা টাকা দিয়েই মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন শোকার্ত স্বজনরা।
নেপথ্যে ১০-১২ জনের প্রভাবশালী চক্র
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনি ও সাদ্দাম হোসেনসহ প্রায় ১০-১২ জনের একটি চক্র এই পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের অধীনে প্রায় দেড় শতাধিক মাইক্রোবাস চলে। তারা সিরিয়াল মেইনটেইন থেকে শুরু করে ভাড়ার রেট নির্ধারণ করে দেয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিন্ডিকেট সদস্য সাদ্দাম হোসেন বলেন, "কোনো সিন্ডিকেট নেই। যে যার মতো ভাড়া আদায় করে। আমরা শুধু ব্যবসা করি, জিম্মি করার কোনো সুযোগ নেই।"
দীর্ঘদিনের এই অরাজকতা নিয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) আবু তালেব বলেন:
"এই অভিযোগটি অনেক পুরনো। আমরা কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। যেহেতু গাড়িগুলো হাসপাতালের বাইরের, তাই আমাদের কিছু করার থাকে না। বিষয়টি নিয়ে পরিচালকের সাথে আবারও কথা বলবো।"
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের এই উদাসীনতায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে চক্রটি। অবিলম্বে এই ‘মরদেহ বাণিজ্য’ বন্ধে পুলিশি পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।